আল্লাহ পাক ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মানবজাতির মহামারি সম্পর্কে যা বলেন!

লেখক : মাওলানা এম এ করিম ইবনে মছব্বির

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা মানবজাতি সৃষ্টি করে আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে ভূষিত করেছেন।  আর এ সৃষ্টির সেরা জীব যদি তার আসল মালিককে ভুলে যায় এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ অমান্য করে, তাহলে তার মালিক তার প্রতি শুধু অসন্তুষ্টই হন না, বরং তাকে শাস্তি দিতে বাধ্য হন।

হাদিস শরিফে প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :‘যখন কোনো কওমের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা তা প্রকাশ্যেও করতে শুরু করে তবে তাদের মাঝে দুর্ভিক্ষ ও মহামারি ব্যাপক আকার ধারণ করে, যা তাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে ছিল না।’ (ইবনু মাজাহ, আসসুনান : ৪০১৯)।

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা বলেন,

ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ‘স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সূরা: রূম, পারা: ৩০, আয়াত: ৪১)।قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِن قَبْلُ كَانَ أَكْثَرُهُم مُّشْرِكِينَ‘বলুন, তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং দেখ তোমাদের পুর্ববর্তীদের পরিণাম কি হয়েছে। তাদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক।’ (সূরা: রূম, পারা: ৩০, আয়াত: ৪২)।হাদিস শরিফে প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :…لَمْ تَظْهَرْ الْفَاحِشَةُ فِي قَوْمٍ قَطُّ حَتَّى يُعْلِنُوا بِهَا إِلَّا فَشَا فِيهِمْ الطَّاعُونُ وَالْأَوْجَاعُ الَّتِي لَمْ تَكُنْ مَضَتْ فِي أَسْلَافِهِمْ‘যখন কোনো কওমের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা তা প্রকাশ্যেও করতে শুরু করে তবে তাদের মাঝে দুর্ভিক্ষ ও মহামারি ব্যাপক আকার ধারণ করে, যা তাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে ছিল না।’ (ইবনু মাজাহ, আসসুনান : ৪০১৯)।

এছাড়াও ইসলামি ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যখন সমাজে জলুম, ব্যায়বিচার, নির্যাতন,  খুন, সন্ত্রাসী কার্যক্রম বৃদ্ধি পায়,  লোভ, লালসা বৃদ্ধি পায়, আপন ভাই আপন ভাইকে দেখতে পারে না, মাকে শত্রু মনে করে, অযোগ্য লোকেরা নেতৃত্বে আসে, বিয়ের উপযুক্ত হয়েও বিয়ে না করে পাপাচারে লিপ্ত হয়,  মদ,গাজা সহ নেশা জাতিয় দ্রব্য প্রকাশ্য পান করে, কন্যা শিশু কে হত্যা করা, জীবিত কবর দেওয়া সহ পাপাচার প্রকাশ্যে বৃদ্ধি পায় তখন সমাজে অসঙ্গতির সৃষ্টি হয়। আবার যখন প্রকাশ্যে অশ্লীলতা দেখা দেয় তখন আল্লাহর ঐ সকল বান্দাদের লানত প্রদান করেন ।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের এসব পাপাচার থেকে সরে আসার জন্য বার বার সুয়োগ দিয়ে থাকেন।  কিন্তু বার বার সুয়োগ দেওয়া সত্ত্বেও যখন আমরা মানুষ জাতি অতিরিক্ত সিমা লঙ্ঘন করি তখন আল্লাহ  এই পৃথিবী ধ্বংস না করে শুদ্ধাচারের জন্য গজব প্রদান করেন। এই গজব আবার বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। কখনো খড়া, কখনো বৃষ্টি,  কখন ঝড়, কখনো  রোগ বালাই আবার কখনো কখনো  নানা ধরনের উপদ্রুপ সৃষ্টি হয়। বর্তমানে বৈশ্বিক মহামারি করোনা এমন এক ধরনে ব্যাধি যা আল্লাহ তায়ালার হুকুমে হয়েছে। যা অতিতে কখনো মানব জাতির মধ্যে এমন ব্যাধি লক্ষন করা যায় নি। এসব রোগ আরোগ্য লাভের জন্য আল্লাহ পাকের নিকট ক্ষমা চাই এবং আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি। আর করোনাসহ নতুন নতুন সংক্রামক রোগ-ব্যাধি ও মহামারী দেখা দিলে তা থেকে আশ্রয় লাভে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা এবং ধৈর্যধারণ করার নসিহত করেছেন বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

বিশেষ করে দুটি দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে বলেছেন তিনি। আর তাহলো->> اَللَّهُمَّ اِنِّىْ اَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْبَرَصِ وَ الْجُنُوْنِ وَ الْجُذَامِ وَمِنْ سَىِّءِ الْاَسْقَامِউচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল বারাচি ওয়াল জুনুনি ওয়াল ঝুজামি ওয়া মিন সায়্যিয়িল আসক্বাম।’ (আবু দাউদ, তিরমিজি)অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আপনার কাছে আমি শ্বেত রোগ থেকে আশ্রয় চাই। মাতাল হয়ে যাওয়া থেকে আশ্রয় চাই। কুষ্ঠু রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে আশ্রয় চাই।

আর দুরারোগ্য ব্যাধি (যেগুলোর নাম জানিনা) থেকে আপনার আশ্রয় চাই।

করণীয়:(১) হাদিসে বর্ণিত মহামাারির কারণগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো প্রতিকারের চেষ্টা চালানো। উপরোক্ত হাদিসে অশ্লীলতার ব্যাপক সয়লাব হওয়াকে মহামারির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং শুধু চীনই নয়, অশ্লীলতায় সয়লাব হয়ে যাওয়া প্রতিটি দেশ ও জাতির সচেতন হওয়ার সময় এসেছে।(২) বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তিগফার করা। কারণ তাওবা বালা-মুসিবত দূর করে দেয়।(৩) মহামারি কবলিত ভূমিতে অবস্থা করলে সেখান থেকে বের হওয়া যাবে না, বরং সবর করতে হবে। কারণ সবাই যদি মহামারি কবলিত এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়, তাহলে আক্রান্তদের সেবাযত্ন করার কেউ থাকবে না। তাই ব্যাপকভাবে নিজ পরিবার-পরিজন ও সমাজের মানুষদের ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া উচিত নয়। তবে অবশ্যই পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।(৪) আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে এবং আল্লাহ যে তাদের শহীদের সওয়াব দান করবেন সে ব্যাপারে আশা রাখতে হবে।(৫) যদি মহামারি এলাকা থেকে দূরে থাকে তবে মহামারি এলাকার আশেপাশে যাবে না।পরিশেষে বলতে চাই, আল্লাহ পাক আমাদের খুবই রাগান্বিত হয়ে আছেন। এখনও শুদ্ধাচারের জন্য তিনি আমাদের বার বার সুযোগ দিয়ে যাচ্ছেন। সময় থাকতে আমরা সবাই তাহার নিকট ক্ষমা চাই আর বার বার তাওবায় করি যেন আমাদের রব আল্লাহ পাক আমাদের অতিতে সকল গোনাহ ক্ষমা করে দেন এবং আমাদের উপর থেকে সকল গজব উঠিয়ে নেয়।

লেখক: সাবেক ইমাম ও খতিব, জাতীয় সংসদ মসজিদ।

সংকলনে: ফখরুল ইসলাম শাকিল