সেলিম রেজার নার্সারি যেনো রকমারী ফলের এক সাম্রাজ্য

রকমারী ফলের বাণিজ্যিক উৎপাদনে সফল হয়েছেন নাটোর তথা দেশের আদর্শ ফল উদ্যোক্তা সেলিম রেজা। ফল উৎপাদনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার, দেশীয় ফলের প্রসার এবং সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করছেন তিনি। আহম্মদপুরে ‘দৃষ্টান্ত এগ্রো ফার্ম এন্ড নার্সারি’ নামে তার প্রায় ১০০ বিঘার ফল সাম্রাজ্য যেন এক জার্ম প্লাজম সেন্টার।

২০০০ সালে এলোভেরাসহ ভেষজ চাষের মধ্যে দিয়ে কৃষিতে অভিষেক ঘটে সেলিম রেজার। দু’বছর পরে নাটোর সদরের আহম্মদপুরে গড়ে তোলেন ৩৮ বিঘার বৃহত্তম আপেল কুল ও থাই কুলের খামার। এই খামারকে কেন্দ্র করে আহম্মদপুরেই গড়ে ওঠে দেশের বৃহত্তম কুলের আড়ৎ, যা বর্তমানে পাশের বনপাড়াতে স্থানান্তরিত হয়েছে। বারোমাসি থাই পেয়ারার বাণিজ্যিক উৎপাদনের পথিকৃৎ সেলিম রেজা। বারোমাসি বাতাবি লেবু, কদবেল ও শরীফার মত দেশীয় ফলের বাণিজ্যিক উৎপাদনে সফল সেলিম রেজার খামারে আছে বেদানা, রাম্বুটান, পার্সিমন, ¯œ্যাকফ্রুট, ম্যাংগোস্টিন আর রাশি-রাশি ড্রাগন এবং আম। খামারের চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নারকেল, আমড়া, পেপে, কলাসহ রকমারী দেশীয় ফল। আর আছে ভিয়েতনামের খাটো জাতের শতাধিক নারকেল গাছ। বর্তমানে এই ফলের খামার প্রায় একশ’ বিঘায় পরিণত হয়েছে। ফল উৎপাদনের অনন্য স্বীকৃতি হিসেবে তার খামারেই সরকারি উদ্যোগে স্থাপন করা হচ্ছে চার টন ধারণক্ষমতার ফল সংরক্ষণ হিমাগার।

আহম্মদপুরের ফল খামারকে সমৃদ্ধ করার পরে ডালসড়কে গড়ে তুলেছেন আরো একটি ফল বাগান। নিরাপদ ফল উৎপাদনে সেলিম রেজা ব্যবহার করছেন বিভিন্ন প্রযুক্তি। তাইওয়ান থেকে আনা মালচিং পেপার ব্যবহারের ফলে মাটির আর্দ্রতা রক্ষার পাশাপাশি সার, সেচ কম লাগছে, আগাছা কম হচ্ছে। ব্যাগিং পদ্ধতির কারনে আম হয়ে উঠছে আকর্ষণীয় আর থাকছে বিষমুক্ত। প্রচলিত পদ্ধতির অবসান ঘটিয়ে খামারগুলোতে আল্টা হাইডেনসিটি টেকনোলজি বা ঘন পদ্ধতিতে গাছ লাগিয়েছেন সেলিম রেজা। তার দাবি সারাদেশে এই পদ্ধতির প্রথম প্রচলন করেছেন তিনি। সেলিম রেজা উদ্যোক্তা সৃষ্টিতেও কাজ করেন বলে তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের কমিউনিটি হর্টিকালচার প্রমোটর হিসেবে কাজ করছেন। জাতীয় পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ১১টি পুরস্কারসহ তার কৃতিত্বের ঝুলিতে ৭৪টি সনদ ও ক্রেস্ট জমা হয়েছে।

সেলিম রেজার রাজ্যে অসংখ্য আম থাকলেও তিনি বর্তমানে ১১টি নাবি জাতের আম নিয়ে কাজ করছেন। তার চেস্টা, কিভাবে আমের উৎপাদন এগিয়ে নিয়ে শীতকাল পর্যন্ত পৌঁছনো যায়। গৌরমতি ছাড়াও এই তালিকায় আছে ব্রনাই কিং, তাইওয়ান গ্রীণ, যাদুভোগ ও বান্দিগুড়িসহ বিভিন্ন আম।
বর্তমানে আহম্মদপুর ও ডালসড়কের খামারে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ড্রাগন, শরীফা ছাড়াও প্রায় ২ হাজার গৌড়মতি আম গাছ। এই গাছের পাতা ল্যাংড়া আম গাছের মত আর গাছের ধরণ খানিকটা আশ্বিণার মত। খামারকে সুশোভিত করে আমের ভারে নুব্জ হয়ে পড়েছে আম গাছগুলো। সুডৌল আমগুলোর সৌন্দর্য নজরকাড়া। এক একটির গড় ওজন পাঁচশ’ গ্রাম। কীটনাশকমুক্ত এবং সম্পূর্ন অর্গানিক রাখতে ব্যাগিং করা হয়েছে প্রায় ১২ হাজার আম। আর ক্ষতিকর পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে প্রায় সব গাছে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে সেক্স ফেরোমন ট্যাব। সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের অভিজাত শহরগুলোতে উচ্চ মূল্যে এই আমের বিপনন শুরু হয়েছে।

গৌরমতির পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজনে খামারে ২০ হাজার চারা উৎপাদন করলেও আগ্রহীদের কাছে বিক্রি করছেন ১০০ থেকে ১২০ টাকা দরে। বাণিজ্যিকভাবে চারা উৎপাদনের করে আগ্রহী ফল চাষীদের মাধ্যমে গৌড়মতির বিস্তার ঘটানোর ইচ্ছার কথা জানালেন সেলিম রেজা। সেলিম রেজা মনে করেন, গৌরমতি নাটোরের জন্যে বাণিজ্যিক সম্ভাবনাময় আম। সেলিম রেজা দেশীয় ফলের প্রসার ঘটাতে বাতাবি লেবু, কামরাঙা, সফেদা, জামরুলসহ উন্নত গাছ সংগ্রহ করছেন। এসব গাছের চারা তৈরী করে উন্নতমানের ফল ছড়িয়ে দিতে চান তিনি।

সেলিম রেজার খামার এলাকায় সরকারিভাবে একটি ফল সংরক্ষণ হিমাগার স্থাপন করায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে ধন্যবাদ জানান সেলিম রেজা। এই হিমাগার স্থাপনের ফলে জেলার ফল উৎপাদকবৃন্দ সংরক্ষণ সুবিধা পেয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হবেন বলে আশা করেন তিনি। বিভিন্ন ফলের জুস উৎপাদন করে বিদেশে রপ্তানীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে এ ব্যাপারে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা আশা করেন সেলিম রেজা।

পরিদর্শনকালে সেলিম রেজার খামারে রোপিত শতাধিক ভিয়েতনামের খাটোজাতের নারকেল গাছের কোনটিতেও ডাব দেখা যায়নি। কিছু গাছের গায়ে আলকাতরার মত পদার্থ লেগে রয়েছে। সেলিম রেজা বললেন, ওইসব গাছ গ্যানোডার্মায় আক্রান্ত হয়েছে-যা মাটির জন্যে ক্ষতিকর। পাঁচ বছরের অক্লান্ত চেষ্টার পরও ফলবিহীন এসব নারকেল গাছ এখন যেন গলার কাঁটা!

নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ পরিচালক সুব্রত কুমার সরকার বলেন, জেলায় কুল, পেয়ারা, লেবু, শরীফা, ড্রাগন গৌড়মতি আমসহ অন্যান্য ফল উৎপাদনে অনন্য অবদান রেখে চলেছেন সেলিম রেজা। তার এই অবদান নাটোরসহ দেশের জন্যে গৌরবের। তার সকল উদ্যোগে কৃষি বিভাগ সব সময় পাশে থাকবে।