রোহিঙ্গা সংকট: গ্রে’প্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারে আন্তর্জাতিক আদালত

মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চির আগমনকে ঘিরে উ’ত্তাল হয়ে উঠছে নেদারল্যান্ডসের হেগ শহর। সু চির উপস্থিতিতে হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মঙ্গলবার শুরু হচ্ছে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গ’ণহ’ত্যা মা’মলার শুনানি। শুনানি শেষে আদালত মিয়ানমারের অ’জ্ঞা’তনামা ব্যক্তিদের বি’রুদ্ধে গ্রে’প্তারি প’রোয়ানা জারি করতে পারেন। এদিকে, হেগে শুনানির প্রাক্কালে মিয়ানমারকে সর্বতোভাবে বয়কট করার আহ্বান জানিয়েছে ৩০টি ইসলামি সংগঠন।



শুনানি উপলক্ষে হেগ শহরে টানা তিন দিন বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে রোহিঙ্গা সংগঠনগুলো। মিয়ানমার সরকার সমর্থকরাও সেখানে সমাবেশ করবে। শুনানিতে ওআইসির পক্ষে মা’মলা দায়ের করা গাম্বিয়ার আইনজীবীরা ১৬ সদস্যবিশিষ্ট আদালতে পূর্ণাঙ্গ শুনানির আগেই সাময়িক পদক্ষেপ নেওয়ার আবেদন জানাবেন। এদিকে আন্তর্জাতিক অ’পরাধ আদালতের যেকোনো রায়ই চূড়ান্ত, বাধ্য’তামূলকভাবে পালনীয়। চূ’ড়ান্ত রায়ের পর আপিলের সুযোগ নেই।



গত অক্টোবরে ইউএন নিউজের কনর লেননকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আইসিজের রেজিস্ট্রার ফিলিপ গটিয়ার। রোববার ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তিন দিনব্যাপী শুনানি চলাকালে জাতিসংঘের এই সর্বোচ্চ আদালতের নিরাপত্তা জোরদার করা হবে। জল্পনা-কল্পনা চলছে, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের বি’রুদ্ধে ব্য’বস্থা নেওয়ার অংশ হিসেবে অ’জ্ঞাতনামা ব্য’ক্তিদের বি’রুদ্ধে



গ্রে’প্তারি প’রোয়ানা জারি করা হতে পারে। তবে মিয়ানমার সরকারের প্রধান হিসেবে সু চিকে দায়মুক্তি দেওয়া হতে পারে। মিয়ানমারের ‘জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য’ সু চি এখন হেগে অবস্থান করছেন। শুনানিতে উপস্থিত থাকছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব মাসুদ বিন মোমেনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল। প্রয়োজনে বাদীপক্ষকে সহায়তা দেবেন তারা।

প্রসঙ্গত, শুনানিতে রোহিঙ্গাদের বি’রুদ্ধে অ’ব্যাহত গ’ণহ’ত্যা বন্ধে জ’রুরি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আদালতের প্রতি আহ্বান জানাবে পশ্চিম আফ্রিকার ক্ষুদ্র দেশ গাম্বিয়া। আদালত সিদ্ধান্ত নেবেন, এ মা’মলার বিচারের এখতিয়ার তাদের আছে কি-না। তবে প্রাথমিক শুনানিতে নি’পীড়িত রোহিঙ্গাদের কারও বক্তব্য শোনা হবে না। ‘ওয়ার্ল্ড কোর্ট’ বা বিশ্ব আদালত হিসেবে পরিচিত আইসিজেতে গত মাসে মা’মলা করে গাম্বিয়া। এতে



কূটনৈতিক ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে ওআইসি। শুনানি শুরুর আগের দিন গাম্বিয়ার উদ্যোগকে সমর্থন দিয়েছে কানাডা এবং নেদারল্যান্ডস। সোমবার এক যৌথ বিবৃতিতে দেশ দুটি বলেছে, জবাবদিহি নিশ্চিত এবং দা’য়মুক্তি রোধ করতে তারা গাম্বিয়াকে সর্বতোভাবে সহায়তা করবে। বিবৃতিতে বলা হয়, মিয়ানমারের নি’রাপত্তা বাহিনীর দায়িত্ব ছিল রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেওয়া।

অথচ নিরাপত্তা বাহিনীই হ’ত্যা’যজ্ঞ চালিয়েছে। জানা গেছে, তৎপরতার অংশ হিসেবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত বব রে ইতোমধ্যে হেগে পৌঁছেছেন। প্রথম দিনই শুনানি শুরু করবেন গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী আবুবকর ম্যারি তামবাবু। তিনি আইন শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন ব্রিটেন থেকে। রুয়ান্ডা গ’ণহ’ত্যা ট্রাইব্যুনালেরও প্রসিকিউটর ছিলেন তিনি।



কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখে যাওয়ার পর তিনি মা’মলা করেছেন। শুনানি সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক দর্শক শুনানি দেখবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার শুনানি শেষ হলেও রায় অপেক্ষমাণ রাখা হতে পারে। হেগের আন্তর্জাতিক অ’পরাধ আদালতেও (আইসিসি) রোহিঙ্গাদের গ’ণহ’ত্যা নিয়ে আরেকটি মা’মলা চলছে। আদালত এ বিষয়ে বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া আর্জেন্টিনার একটি আদালতেও রোহিঙ্গা গ’ণহ’ত্যায় সু চির বি’রুদ্ধে মা’মলা হয়েছে।



এদিকে সু চি যখন রোহিঙ্গা গ’ণহ’ত্যার পক্ষে সাফাই গাইতে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতে গেছেন, ঠিক তখনই মিয়ানমারকে বয়কটের ডাক দিয়েছে ১০টি দেশের ৩০টি সংগঠন। শুনানি সামনে রেখে নেপিদোর ওপর চাপ জোরালো করতেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্স জানায়, জার্মানিভিত্তিক ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশনস নামের প্ল্যাটফর্ম থেকে ‘বয়কট মিয়ানমার ক্যাম্পেইন’ শুরু করা হয়েছে। সংগঠনটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গ’ণহ’ত্যা মা’মলার শুনানিকে সামনে রেখে ৩০টি সংগঠন মিয়ানমারের বি’রুদ্ধে অ’র্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ফরাসি ডট কো, রেস্টলেস বিংস, ডেস্টিনেশন জাস্টিস, রোহিঙ্গা হিউম্যান রাইটস নেটওয়ার্ক অব কানাডা, রোহিঙ্গা হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভ অব ইন্ডিয়া ও এশিয়া সেন্টারের মতো সংগঠনগুলো। ফি রোহিঙ্গা কোয়ালিশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নাই সান লুইন বয়কট কর্মসূচি প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান মিশন স্পষ্ট করেছে যে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জা’তিকে নি’র্মূল করে দেওয়ার একটি নী’তি গ্র’হণ করা হয়েছে।



রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী হিসেবে আমরা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অধীনে ১৫ বছর গৃ’হবন্দি থাকা অং সান সু চির মু’ক্তির আন্দোলন করে এসেছি। তবে তিনি সেই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর খু’নি সে’নাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে চলছেন। তাই আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে সবার প্রতি আহ্বান জানাই।’ এদিকে হেগের আদালতে শুনানির প্রাক্কালে গ’ণহ’ত্যার বিচার চেয়েছেন নি’পীড়িত রো’হিঙ্গারা। কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শিক্ষক মোহাম্মদ জোবায়ের রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা হ’ত্যা, নি’র্যাতন ও ধ’র্ষণ দেখেছি।

আমাদের চোখের সামনেই অনেককে হ’ত্যা করা হয়েছে। আমাদের ঘরবাড়ি যখন জ্ব’লছে, তখন প্রাণ বাঁচা’তে আমাদের পা’লাতে হয়েছে। এখন মিয়ানমারকে তাদের ভ’য়াবহ অ’পরাধের জন্য জবাবদিহি করতে বা’ধ্য করার দায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের। রোহিঙ্গাদের বি’রুদ্ধে গ’ণহ’ত্যার জন্য তাদের বিচার হতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় আসার আগে সু চি বলেছিলেন, সেনাবাহিনী ধ’র্ষ’ণকে হা’তিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। আর এখন তিনি সেনাদের র’ক্ষাকারী। কী ল’জ্জা! আমরা শুনানির অপেক্ষায়। তবে দুর্ব’ল গতির ইন্টারনেটের কারণে শুনানি দেখতে পাব কি-না জানি না।’



ভুক্তভোগী রশিদ আহমেদের পরিবারের ১২ সদস্যকে খু’ন করেছে মি’য়ানমার বাহিনী। তিনি বলেন, ‘শুধু ন্যা’য়বিচার পেলেই আমাদের ক্ষ’ত সারবে। আমি জানি তাদের আর ফেরত পাব না। তবে খু’নিরা শা’স্তি পেলে তাদের আ’ত্মা শা’ন্তি পাবে।’ কোলে তিন বছর বয়সী সন্তানকে নিয়ে অ’শ্রু’সিক্ত ন’য়নে মমতাজ বেগম বলেন, সেনারা আমার স্বা’মীকে হ’ত্যা করেছে।

তাকে ধ’র্ষণ করেছে। তার ছয় বছর বয়সী সন্তানকে মাথায় ছু’রিকাঘা’ত করেছে। তিনি ন্যা’য়বিচার চান। এদিকে গত অক্টোবরে জা’তিসংঘ সদর দপ্তরে আইসিজের ন’বনিযুক্ত রেজিস্ট্রার ফিলিপ গটিয়ার জানিয়েছিলেন, গ’ণহ’ত্যার মা’মলার বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের যে কোনো রায়ই চূড়ান্ত, বা’ধ্যবাধকতাপূর্ণ ও অবশ্যপালনীয়। চূড়ান্ত রায়ের পর আপিলের কোনো সুযোগ নেই।bd24live