সাগর থেকেই পাইপলাইনে খালাস হবে জ্বালানি তেল

আমদানি করা পরিশোধিত এবং অপরিশোধিত জ্বালানি তেল দ্রত খালাস করতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ‘ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন’ অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিপিসির সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। ইতোমধ্যে এই প্রকল্পের আওতায় কতুবদিয়া থেকে মাতারবাড়ি পর্যন্ত সমুদ্রে পাইপলাইন স্থাপন কাজ শেষ হয়েছে। অন্যান্য কাজও শেষ হওয়ার পথে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে গভীর সমুদ্রে নোঙর করা বড় জাহাজ থেকে জ্বালানি তেল খালাসে লাইটার জাহাজের দরকার হবে না। বরং পাইপলাইনের মাধ্যমে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় খালাস হবে ১ লাখ ২০ হাজার টন তেল, যা আগে খালাসে সময় লাগত ১২ দিন। এছাড়া প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সারাদেশে জ্বালানি তেল সরবরাহেও গতিশীলতা বাড়বে। বাড়বে দেশে জ্বালানি তেল মজুদ ক্ষমতাও।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, এসপিএম প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে সরকারের অন্তত ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে সারাদেশে আধুনিক তেল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। এসপিএম পাইপলাইন ছাড়াও সরকার আরও কয়েকটি পাইপলাইনের মাধ্যমে সারাদেশে তেল সরবরাহের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। এর মাধ্যমে দ্রুতগতিতে সারাদেশে আধুনিক পদ্ধতিতে তেল সরবরাহ করা যাবে।

সাধারণত আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থায় প্রতিনিয়ত গভীর সমুদ্রে নোঙর করা থাকে তেলবাহী মাদার ভেসেল বা বড় জাহাজ। সেখান থেকে লাইটার বা ছোট জাহাজে তেল বিপিসি ডিপোতে আনা হয়। এরপর আবার জাহাজে করে তেল দেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত ডিপোতে পৌঁছে দেওয়া হয়। তেল পরিবহনের এসব প্রক্রিয়া ঝামেলাপূর্ণ ও ব্যয়বহুল। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে জাহাজ থেকে তেল খালাস করতে না পারায় বছরে কোটি কোটি টাকা ক্ষতিপূরণও গুণতে হচ্ছে বিপিসিকে। ফলে তেল পরিবহন ব্যবস্থা বিশ্বের অন্য দেশের মতো আধুনিকায়নে ২০১৫ সালে এসপিএম উইথ ডাবল পাইপলাইন প্রকল্প হাতে নেয় ইআরএল। চলতি বছরের আগস্টে প্রকল্পটি পুরোপুরি শেষ হওয়ার কথা ছিল। বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারির কারণে প্রকল্পটির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়েছে। ফলে আগামী বছরের আগস্টের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন কাজ শেষ হবে।

জানা গেছে, এসপিএম প্রকল্পটি মহেশখালী দ্বীপের পশ্চিম পার্শ্বে সাগরে স্থাপিত হয়েছে। সেখানে জাহাজ থেকে তেল সরাসরি পাম্প করা হবে। যা এসপিএম হয়ে অফশোর পাইপলাইনের মাধ্যমে মাতারবাড়ি যেখানে ল্যান্ড টার্মিনাল শেষ হয়েছে সেখানে পৌঁছাবে। পরে সেখান থেকে অনশোর পাইপলাইনের মাধ্যমে মহেশখালী এলাকায় নির্মিতব্য স্টোরেজ ট্যাংকে জমা হবে। এসপিএম থেকে ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসের দুটি পৃথক পাইপলাইনের মাধ্যমে ক্রুড অয়েল এবং ডিজেল আনলোডিং করা হবে। ট্যাংক থেকে পাম্পিংয়ের মাধ্যমে তেল প্রথমে অনশোর ও পরবর্তীতে অফশোর পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রামের গহিরা ল্যান্ড টার্মিনালের শেষ পর্যন্ত আসবে। সেখান থেকে পুনরায় অনশোর পাইপলাইনের মাধ্যমে কর্ণফুলী ইপিজেডের ভেতর দিয়ে ডাঙ্গারচর পর্যন্ত এসে কর্ণফুলী নদী এইচডিডি পদ্ধতিতে অতিক্রম করে পদ্মা অয়েল কোম্পানির ভেতর দিয়ে ইআরএলে পাঠানো হবে। ট্যাংক ফার্ম থেকে ১৮ ইঞ্চি ব্যাসের দুটি পৃথক পাইপলাইনের মাধ্যমে ডেলিভারি করা হবে ক্রুড অয়েল এবং ডিজেল।

বিপিসি সূত্র বলছে, জার্মানির আইএলএফ কনসালটিং ইঞ্জিনিয়ারস প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড (সিপিপিইসি) জি টু জি ভিত্তিতে প্রকল্পের ইপিসি ঠিকাদার হিসেবে আছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বার্ষিক জ্বালানি তেল আনলোডিং ক্ষমতা হবে মোট ৯.০ মিলিয়ন টন। এক লাখ ২০ হাজার ডিডব্লিউটি ক্রুড অয়েল ট্যাংকার মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় এবং ৭০ হাজার ডিডব্লিউটি ডিজেল ট্যাংকার মাত্র ২৮ ঘণ্টায় খালাস হবে।

প্রকল্পে মোট অফশোর পাইপলাইন ১৩৫ কিলোমিটার। এ ছাড়া এইচডিডি ক্রসিংয়ের অফশোর অংশ ১১ কিলোমিটারসহ মোট ১৪৬ কিলোমিটার। এ ছাড়া অনশোর পাইপলাইন ৭৪ কিলোমিটার। ১৮ ইঞ্চি এবং ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন প্রায় ২২০ কিলোমিটার। প্রকল্প সূত্রে জানা যায় এসপিএম প্রকল্পের আওতায় মহেশখালী এলাকায় স্টোরেজ ট্যাংক ও পাম্পিং স্টেশন স্থাপন হবে ৩টি ক্রুড অয়েল (প্রতিটির নেট ধারণক্ষমতা ৫০ হাজার ঘনমিটার) ও ৩টি ডিজেল ট্যাংক (প্রতিটির নেট ধারণক্ষমতা ৩০ হাজার ঘনমিটার), স্কাডা, প্রধান পাম্প, বুস্টার পাম্প, জেনারেটর, মিটারিং স্টেশন, পিগিং স্টেশন, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকবে।

এ বিষয়ে বিপিসির চেয়ারম্যান এবিএম আজাদ গত মঙ্গলবার এসপিএম প্রকল্প পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের বলেন, ‘কোভিডের কারণে প্রকল্পটি কিছুটা পিছিয়েছে। প্রকল্পটি চালু করতে নতুন শিডিউল নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী বছরের আগস্টের মধ্যে প্রকল্পটি চালু করা যাবে। যদিও সময় বৃদ্ধির কারণে প্রকল্প খরচ কিছুটা বাড়বে। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বছরে পরিবহন খরচ বাবদ সরকারের প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। বর্তমানে দেশে সোয়া দুই মাসের তেল রিজার্ভ ক্ষমতা আছে। এসপিএম প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে প্রায় আড়াই মাসের তেল রিজার্ভ ক্ষমতা হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে সরকার তেলের রিজার্ভ ক্ষমতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ক্রমান্বয়ে তা বাড়ানো হবে।