চট্টগ্রামে বস্তিতে আগুন ৯ জনের প্রাণহানি

নগরীর বাকলিয়া থানার চাকতাইয়ের ভেড়ামার্কেট এলাকায় বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনায় ঘুমন্ত নয়জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অনেকে। রোববার ভোর রাত সাড়ে ৩টার দিকে এ অগ্নিকা-ের সূত্রপাত। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আগুনের বিস্তার কমে আসে। অগ্নিকা-ে পাঁচটিরও বেশি কলোনিতে বিভক্ত বেড়া মার্কেট সংলগ্ন বস্তির প্রায় দুই শতাধিক ঘর ও দোকান পুড়ে যায়। বস্তির বাসিন্দারা ঘরের ভেতর থেকে তালা মেরে ঘুমাতেন। এজন্য দ্রুত বের হতে না পারায় নিহতের সংখ্যা বেশি হয়েছে বলে বাসিন্দারা জানান। দ্রুত ঘরের মালপত্র বের করতে না পারায় আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে। 

ফায়ার সার্ভিস জানায়, ঘটনার পরপরই ১০টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে আগুনের বিস্তার কমে আসে। সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পরপরই হতাহতের খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। এ সময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অবস্থায় ঘটনাস্থল থেকে ৮ জনের দগ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘুমন্ত অবস্থায় আগুনে পুড়ে তাদের মৃত্যু হয় বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয় ফায়ার সার্ভিস। নিহতরা হলেনÑ একই পরিবারের রহিমা আক্তার (৩৬), তার মেয়ে নাজমা আক্তার (২৭), জাকির হোসেন বাবু (৮), নাসরিন (১৬) এবং আরেক পরিবারের হাসিনা আক্তার (৩৫), আয়েশা (৩৭), সোহাগ (১৯) ও অজ্ঞাতপরিচয় একজন। রোববার সকাল পৌনে ১০টার দিকে উদ্ধার করা হয় ৭ থেকে ৮ মাসের আরেকটি শিশুর লাশ। সব মিলে উদ্ধার লাশের সংখ্যা ৯। ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক জসিম উদ্দীন জানান, আগুনে দগ্ধ হয়ে দুই পরিবারের সাতজনসহ ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। 

তিনি আলোকিত বাংলাদেশকে জানান, খবর পাওয়া মাত্রই ফায়ার সার্ভিসের বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। ফায়ার সার্ভিসের চন্দনপুরা, লামারবাজার, নন্দনকানন ও আগ্রাবাদ স্টেশনের ১০টি গাড়ি আগুন নেভানোর কাজে অংশ নেয়। কয়েক ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে আগুন লাগার কারণ জানা যায়নি। এদিকে সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, অগ্নিকা-ের ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাশহুদুল কবীরকে আহ্বায়ক ও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা আলী আকবরকে সদস্য সচিব করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া নিহতদের দাফনের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রত্যেক পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাস্থল সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, চট্টগ্রাম নগরীর চাক্তাইয়ে কর্ণফুলী নদী এবং রাজাখালী খালের মোহনায় গড়ে ওঠা চর দখল করে বানানো হয় বিশাল বস্তি। কর্ণফুলী নদীর তীর থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য যেসব জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে তার মধ্যে চাক্তাইয়ের বেড়া মার্কেট সংলগ্ন বস্তিটিও আছে। কর্ণফুলীতে উচ্ছেদ শুরুর পর জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা গিয়ে একাধিকবার বস্তির বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে প্রায় দুশোরও বেশি বস্তিঘরের বাসিন্দা  চলে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। কিন্তু সরকারি এ খাসজমির দখলদাররা এতে বাদ সাধেন। কখনও হুমকি-ধমকি, আবার কখনও হাইকোর্টে গিয়ে উচ্ছেদ বন্ধে স্থগিতাদেশ আনার কথা বলে তাদের থাকতে বাধ্য করেন। এরপরও অনেকে বস্তি ছেড়ে চলে যান। যারা থেকে গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ৯ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে আগুন। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন জানান, যে জায়গায় আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, প্রকৃত বেড়া মার্কেট সংলগ্ন কলোনির অবস্থান এর থেকে আরও প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী মেরিন রোডের উত্তরে রাজাখালী খালের চর দখল করে ২০০০ সালের দিকে গড়ে তোলা হয় নতুন বস্তি। বর্তমানে এ বস্তির নিয়ন্ত্রণ আছে নগরীর ৩৫ নম্বর বকশিরহাট ওয়ার্ড যুবলীগের সহ-সভাপতি আকতার ওরফে কসাই আকতারের নিয়ন্ত্রণে। তার সঙ্গে আছে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী করিম নামে আরও একজন। তারা স্থানীয় সাত্তার, হেলাল, ফরিদ, বেলালসহ কয়েকজনকে এই বস্তির ভাড়াটিয়াদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দিয়েছে। তারাই বস্তি থেকে প্রতিমাসে ভাড়া তোলেন। নিজেরা ভাগবাটোয়ারা করেন সেই ভাড়ার টাকা।
বস্তিতে বসবাসকারী দুই শতাধিক পরিবারের মধ্যে আগুন লাগার আগ পর্যন্ত ৬০ থেকে ৭০টি পরিবার ছিল বলে জানিয়েছেন সেখানে বসবাসরতরা। বস্তির কয়েকটি কলোনির প্রতিটি কলোনিতে ১০ থেকে ১২টি করে পরিবার তখনও বসবাস করছিল বলে তারা জানান। মেরিন ড্রাইভ রোডের একপাশে আগুনে পুড়ে যাওয়া বস্তি এবং আরেক পাশে আরও একটি বস্তি আছে, যেটা কসাই আকতারের বস্তি নামে পরিচিত। সেটিও কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী চরের জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের স্থানীয় এক নেতা জানান, কসাই আকতার একসময় বিএনপি করত। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত কয়েক বছর ধরে সে নিজেকে আওয়ামী লীগ পরিচয় দিচ্ছে। এখন শুনতে পাচ্ছি সে যুবলীগের পদে আছে।
এদিকে দুই সপ্তাহ আগে বস্তিতে গিয়ে সরে যাবার নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানেন না বলে দাবি করেছেন স্থানীয় বাকলিয়া থানার ওসি প্রণব চৌধুরী। তিনি জানান, আমার কাছে লিখিত কোনো নির্দেশনা আসেনি। কেউ বস্তিতে এসে তাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেনÑ এমন খবরও আমার জানা নেই।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন জানান, বস্তির মালিক কারা, সেটা আমরা খতিয়ে দেখব। এই বস্তি বৈধ কি অবৈধ সেটাও আমরা তদন্ত করে দেখব।
এদিকে রোববার দুপুরে অগ্নিকা-ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে যান পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম ও চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। এসময় স্থানীয় কাউন্সিলর হাজী নূরুল হকও তাদের সঙ্গে ছিলেন।
তালা মেরে ঘুমানোই কাল হলো : মাদকাসক্তের উৎপাত, চোর আর অজানা আতঙ্কে ভেতর থেকে তালা মেরে বস্তির ঘরগুলোতে ঘুমাতেন ভাড়াটিয়ারা। এ কারণে আগুন লাগার পর তারা দ্রুত ঘর ছাড়তে পারেননি, আবার মূল্যবান জিনিসপত্রও বের করতে পারেননি। ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন ও ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মো. জসীম উদ্দীনের কাছ থেকে তালা মেরে ঘরে থাকার বিষয়টি জানা যায়।
খুরশিদা বেগম নামে বস্তির ভাড়াটিয়া জানান, তিনি এ বস্তিতে থাকেন ২ বছর ধরে। তিনি বলেন,  ১ হাজার ৮০০ টাকায় ঘর ভাড়া নিয়েছিলাম। চোরের উৎপাতে ঘরের বাইরে কিছু রাখার জো নেই। রান্নার মাটির চুলাটাই শুধু বাইরে থাকে। রাতে সবাই ভেতর থেকে তালা মেরে ঘুমাই। অগ্নিকা-ের সময় তালার চাবি খুঁজতেই সময় শেষ। এতে আগুনে ছাই হয়ে যায় সব সহায় সম্পদ। অগ্নিকান্ডের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক মো. জসীম উদ্দীন জানান, সরকারি খাস জমিতে গড়ে তোলা এ বস্তির কাঁচা ঘরগুলো খুবই কাছাকাছি। এখানে প্রচুর দাহ্যবস্তু রয়েছে। বৈদ্যুতিক সংযোগও আছে। অনেকে মশার কয়েল জ্বালিয়ে ঘুমায়, বিড়ি-সিগারেট খায়। রান্নার জন্য গ্যাস সিলিন্ডার আছে। তাই আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে তা এ মুহূর্তে বলা মুশকিল। অগ্নিকা-ের সঙ্গে কোনো নাশকতাকারী জড়িত কিনা তা তদন্ত সাপেক্ষে বলা যাবে। জেলা প্রশাসক ৪ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। তদন্তের পর বলা যাবে  কীভাবে আগুন লেগেছে বস্তিতে।