কোভিড-১৯ : দেশে করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের শঙ্কা

দেশে কমে আসছে করোনার দাপট। দ্বিতীয় ঢেউয়ের সর্বোচ্চ চূড়া থেকে নামছে এ মহামারি। মৃত্যু, সংক্রমণ এবং শনাক্তের হার সবকিছুই নিম্নমুখী। তবে ভয়ংকর সময় গেছে জুলাই মাসে। সে মাসে মৃত্যু ও সংক্রমণ সর্বোচ্চ চূড়ায় ওঠে। জুলাইয়ে দুদফা কঠোর লকডাউন ও নানা উদ্যোগের পর আগস্টে কমতে শুরু করে প্রাণঘাতী এ ভাইরাসের প্রকোপ।

গত এক মাসে শনাক্তের হার কমেছে ১৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। আগের মাসের চেয়ে আগস্টে সংক্রমণ কমেছে ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। এ সময় মৃত্যু কমেছে প্রায় ১১ শতাংশ। টানা পাঁচ দিন ধরে মৃত্যু একশর নিচে। শনাক্তের হার ১০ শতাংশের ঘরে। হাসপাতালগুলোতে কমছে রোগীর চাপ। লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দও নেই আগের মতো। শয্যা সংকটে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে রোগী ও স্বজনদের ছুটে চলার দৃশ্যও চোখে পড়ে না।

তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে মৃত্যু ও সংক্রমণ কমলেও এখনো পুরোপুরি স্বস্তির পর্যায়ে আসেনি। স্কুল-কলেজ ছাড়া দোকানপাট, শপিংমল, গণপরিবহণ, বাজার সবকিছু খোলা। সবখানে উপেক্ষিত স্বাস্থবিধি। কিছু মানুষের মধ্যে মাস্ক পরার প্রবণতা দেখা গেলেও কোথাও নেই শারীরিক দূরত্ব।

সাধারণ মানুষের উদাসীনতার পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকেও স্বাস্থ্যবিধি মানানোর তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। শতভাগ মাস্ক পরাতে প্রয়োজনে আইন প্রয়োগের কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়নে নেই কোনো উদ্যোগ। এভাবে চলতে থাকলে ফের বাড়তে পারে সংক্রমণ। শঙ্কা রয়েছে তৃতীয় ঢেউয়ের।

জানতে চাইলে আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ড. মোশতাক হোসেন বলেন, বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে, এটা ভালো খবর। লকডাউনসহ সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপ এবং ব্যক্তিসচেতনতার কারণে এ সফলতা আসছে। কিন্তু এখনো স্বস্তিবোধ করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে করোনার নিুমুখী প্রবণতা ধরে রাখতে হবে। তিনি বলেন, একদিন আগে কিংবা পরে করোনার তৃতীয় ঢেউ আসবেই। সাবধান থাকতে হবে।

বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. মো. রোবেদ আমিন বলেন, করোনা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে। কিন্তু এখনো তা স্বস্তির নয়। কোভিড-১৯ এর স্টেবল ট্রান্সমিশন যদি বলি, তাহলে পাঁচ শতাংশের নিচে নিয়ে আসতে হবে। এখনো আমাদের সংক্রমণের হার ১২ শতাংশের মতো। এই পাঁচ শতাংশে আসার পরও যে একটি দেশ কোভিড-১৯ থেকে মুক্ত হয়ে যাবে তা বলা যাবে না। যখন আমরা বলতে পারব ২৪ ঘণ্টায় কোনো করোনা রোগী শনাক্ত হয়নি। কোনো মৃত্যু হয়নি। এই অবস্থা দুই থেকে তিন সপ্তাহ রাখতে পারলে বলা যাবে, কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছি।

গত বছর ৮ মার্চ দেশে করোনা শনাক্ত হয়। এর দশ দিন পর প্রথম মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ বছর এপ্রিল থেকে করোনা সংক্রমণ ফের বাড়তে থাকে। মে মাসে দেশে মোট মারা যায় ১১৬৯ জন আর শনাক্ত রোগী সংখ্যা ৪১ হাজার ৪০৮। জুন মাসে বাড়ে মৃত্যু ও সংক্রমণ। এ মাসে মোট মারা যায় ১৮৮৪ জন এবং শনাক্ত হয় এক লাখ ১২ হাজার ৭১৮ জন। আগের মাসের চেয়ে জুনে সংক্রমণ বাড়ে দ্বিগুণের বেশি। করোনা ভয়াবহ রূপ নেয় জুলাইয়ে।

এ মাসে শনাক্ত, মৃত্যু এমনকি নমুনা পরীক্ষায় হয় রেকর্ড। এ মাসে সর্বাধিক ১১ লাখ ৩১ হাজার ৯৬৭টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। শনাক্ত হয় ৩ লাখ ৩৬ হাজার ২২৬ জন। করোনা শুরুর পর জুলাই মাসে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ১৮২ জনের মৃত্যু হয়। ২৮ জুলাই সর্বোচ্চ ৫৬১৫৭টি নমুনা সংগ্রহ এবং ৫৩ হাজার ৮৭৭টি পরীক্ষা করা হয়। ওইদিন দেশে দৈনিক সর্বোচ্চ ১৬২৩০ জনের দেহে করোনা শনাক্ত হয়। ২৪ জুলাই শনাক্তের হার ছিল সর্বোচ্চ ৩২ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

ভয়ংকর জুলাই থেকে আগস্টে কমতে থাকে মৃত্যু ও সংক্রমণ। আগস্টে মোট মৃত্যু হয়েছে ৫ হাজার ৫১০ জন, যা আগের মাসের চেয়ে ৬৭২ জন কম। আগস্টে মোট রোগী শনাক্ত হয়েছে ২ লাখ ৫১ হাজার ১৩৪ জন, যা আগের মাসের চেয়ে ৮৫ হাজার ৯২ জন কম। ৩১ জুলাই শনাক্তের হার ছিল ৩০ দশমিক ২৪ শতাংশ। ১ সেপ্টেম্বর তা কমে হয়েছে ১০ দশমিক ১১ শতাংশ।

২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু ৭৯ শনাক্ত ৩০৬২ : ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭৯ জন মারা গেছে। আগের দিন মারা যায় ৮৬ জন। সব মিলিয়ে দেশে করোনায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ২৬ হাজার ২৭৪। একদিনে নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ৬২ জন। আগের দিন শনাক্ত হয় ৩ হাজার ৩৫৭ জন। এ নিয়ে করোনাভাইরাসে শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ৩ হাজার ৬৮০। একদিনে সুস্থ হয়েছেন ৫ হাজার ৯৯৯ জন। এখন পর্যন্ত সুস্থ হলেন ১৪ লাখ ৩১ হাজার ৯৮৪ জন। ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ১০ দশমিক ১১ শতাংশ। আগের দিন এ হার ছিল ১১ দশমিক ৯৫ শতাংশ। বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।