আবারও সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য দারুণ সুখবর

অবশেষে আজ থেকে কার্যকর হচ্ছে বহুল আলোচিত সরকারি চাকরি আইন-২০১৮। প্রতীক্ষিত আইনটি কার্যকরের তারিখ নির্ধারণ করে বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি আদেশ জারি করা হয়।

সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ এর প্রথম অধ্যায়ের ৫ ধারায় বলা হয়েছে সরকার সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা যে তারিখ থেকে নির্ধারণ করবে সে তারিখ থেকে এ আইন কার্যকর হবে। ২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর সরকারি চাকরি আইনের গেজেট জারি হয়। সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জন্য আইন প্রণয়নের বাধ্যবাধকতা থাকলেও এর আগে কোনো সরকারই এ আইন প্রণয়ন করেনি। তারা বিধি, নীতিমালা ও প্রয়োজনমতো নির্দেশনাপত্র জারি করে সরকারি কর্মচারীদের পরিচালনা করে আসছেন।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ২০০৯ সালের ১৪ দলীয় জোট সরকারের সময় এ আইনটি প্রণয়নের কাজে হাত দেয় সরকার। প্রায় ১০ বছর ধরে আইনটি ঘষামাজার পর গেজেট প্রকাশ করা হয়। আইনটি প্রণয়নে প্রায় ৫৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার, যা আইন প্রণয়নের ইতিহাসে বিরল ঘটনা বলে অভিহিত করেন অনেকেই।

প্রথমদিকে সরকারি কর্মচারী আইন, তারপর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আইন, তারপর প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী আইন নামে খসড়া প্রণয়ন করা হয়। সবশেষে সরকারি চাকরি আইন নামে আইনটির নামকরণ করা হয় এবং সে নামেই গেজেট প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সরকারি চাকরি আইনে বিভিন্ন ধারায় অসংগতি থাকা সত্ত্বেও তা কার্যকর করা হচ্ছে। কার্যকরের আগেই আইনটিতে দুর্বলতা ধরা পড়া সত্যিই লজ্জাকর বলে মনে করছেন অনেক কর্মকর্তা।

আইনটিতে ১৩টি অধ্যায় রয়েছে। আইনটির একাদশ অধ্যায়ে সরকারি কর্মচারীদের ফৌজদারি অপরাধ বিষয়ে বলা হয়েছে। একাদশ অধ্যায়ের ৪১ এর (১) উপধারায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারীর দায়িত্বপালনের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগে দায়ের করা ফৌজদারি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র গ্রহণ হওয়ার আগে তাকে গ্রেপ্তার করতে হলে সরকার বা নিয়োগকার কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি নিতে হবে।

একই অধ্যায়ের দুই উপধারায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে আদালতে ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন থাকলেও বিভাগীয় মামলা দায়ের বা নিষ্পত্তিতে কোনো বাধা থাকবে না। ৪২ এর (১) উপধারায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী ফৌজদারি মামলায় মৃত্যুদন্ড অথবা এক বছর মেয়াদে কারাদন্ডে দন্ডিত হলে ওই দন্ড আরোপের রায় বা আদেশের তারিখ থেকে তিনি চাকরি থেকে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত হবেন।

তবে রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন তাকে অনুরূপ শাস্তি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিশেষ কারণ বা পরিস্থিতি রয়েছে তা হলে তিনি তাকে শাস্তি থেকে অব্যাহতি দিতে পারবেন। রাষ্ট্রপতি শাস্তি মওকুফ করলে তিনি চাকরিতে পুনর্বহাল হবেন।

বরখাস্ত ব্যক্তি মামলার আপিলে খালাসপ্রাপ্ত হলে তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হবে। দন্ডি ব্যক্তি আপিল আদালতে খালাসপ্রাপ্ত হলে আরোপিত দন্ডাদেশ প্রত্যাহার করা হবে। খালাসপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারী অবসরে যাওয়ার সময় হলে তিনিও আর্থিক সুবিধাদি পাবেন। আইনটির দ্বাদশ অধ্যায়ে কর্মচারীদের অবসর ইস্তফা প্রদানের বিষয়ে বলা হয়েছে। একজন কর্মচারী ৫৯ বছরে এবং মুক্তিযোদ্ধা কর্মচারীরা ৬০ বছর বয়সে অবসরে যাবেন।

যেসব দুর্বলতা নিয়ে কার্যকর হচ্ছে আইনটি : অনুমোদনের পর আইনটি তাৎক্ষণিক কার্যকর করা হলে সরকারি কাজে কোনো অসুবিধা হবে কি না তা পর্যালোচনার জন্য একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ওয়ার্কিং গ্রুপ আইনের ওপর পর্যালোচনা করে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, আইনের ৬১ ধারা অনুসারে আগের ছয়টি আইন রহিত করতে হবে। তার মধ্যে পাবলিক অ্যাম্পোলয়িজ ডিসিপিলিন অর্ডার ১৯৮২ এবং উদ্বৃত্ত সরকারি কর্মচারী আত্তীকরণ আইন ২০১৬ এর কার্যাবলি সম্পাদনের জন্য নতুন করে বিধিমালা প্রণয়ন করা জরুরি প্রয়োজন হবে। এছাড়া সার্ভিসেস অ্যাক্টস ১৯৭৫ রহিত হলে কোনো অসুবিধা হবে কি না সে বিষয়ে অর্থ বিভাগের মতামত চাওয়া হলে অর্থ বিভাগ বলেছে, দি সার্ভিসেস অ্যাক্টস রহিত করা হলে পাবলিক বডি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, সংস্থাগুলোর ইউনিফাইড পে-স্কেলের আইনগত ভিত্তি থাকবে না।

বাস্তবে অধিকাংশ পাবলিক বডি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাই জাতীয় বেতন স্কেল অনুসরণ করে থাকে এবং দি সার্ভিসেস অ্যাক্টস ১৯৭৫ এর আইনের ৫ এর উপধারা (১) ও (২) ধারা বলে সরকার পাবলিক বডি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বেতন স্কেল ভাতাদি নির্ধারণ করে থাকে। এ আইন রহিতের পর ওই সব প্রতিষ্ঠানের জন্য জাতীয় বেতন স্কেল অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতা থাকবে না। সরকার ওই সব প্রতিষ্ঠানের বেতন-ভাতাদি নির্ধারণ করে দিলে তার আইনগত ভিত্তি না থাকার কারণে অকার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। অপরদিকে ওই সব প্রতিষ্ঠান নিজস্ব আইন বলে ভিন্ন ভিন্ন বেতন স্কেল নির্ধারণ করলে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা সৃষ্টি হতে পারে।

এ কারণে সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ এর আংশিক সংশোধনপূর্বক ওই আইনের ৬১ ধারায় রহিতকৃত ছয়টি আইনের মধ্য থেকে দি সার্ভিসেস অ্যাক্টস ১৯৭৫ আইনটি পুনর্বহাল করা যেতে পারে। অর্থ বিভাগের উল্লিখিত মতামত পাওয়ার পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নড়েচড়ে বসেছে। তারা বলছে, সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ এর ১ ধারার ৩ উপধারায় বলা হয়েছে যে, অন্য কোনো আইন, চুক্তি বা সমজাতীয় দলিলে ভিন্নরূপ বিধান না থাকলে সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ এর বিধানাবলি স্বশাসিত সংস্থা ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য হবে না। আইনটি স্বশাসিত সংস্থা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য না হলেও আইনের কিছু ধারা তাদের জন্য প্রযোজ্য হবে।

সরকারি চাকরি আইনের ১ ধারার ৪ উপধারায় বলা হয়েছে, যেসব কর্ম, বা কর্মবিভাগ বা তাতে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য ৬১ এর অধীন রহিতকৃত যে কোনো আইনের বিধান যেভাবে প্রযোজ্য ছিল, সেসব বিধানের বিষয়বস্তুর প্রতিফলনে যেসব বিধান এ আইনে সংযোজিত হয়েছে তা প্রযোজ্য থাকবে। দি সার্ভিসেস অ্যাক্ট-১৯৭৫ এর ধারা ৫ এর ১ ও ২ উপধারার বিষয়বস্তু হলো বেতন গ্রেড, স্কেল ও অন্য সুবিধাদি নির্ধারণসংক্রান্ত। সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ এর ১৫ নম্বর ধারার বিষয়বস্তু একই।

অর্থাৎ সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ এর ১৫ নম্বর ধারা দি সার্ভিসেস অ্যাক্ট-১৯৭৫ এর ধারা ৫ এর ১ ও ২ উপধারার বিষয়বস্তুর প্রতিফলনে সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ এ সংযোজিত হয়েছে। সুতরাং দি সার্ভিসেস অ্যাক্ট ১৯৭৫ এর ৫ ধারা ১ ও ২ উপধারা যাদের জন্য প্রযোজ্য ছিল সরকারি চাকরি আইন ২০১৮ এর ১৫ নম্বর ধারা তাদের জন্য প্রযোজ্য হবে। দি সার্ভিসেস অ্যাক্ট ১৯৭৫ এর ৫ ধারা উপধারা ১ ও ২ পাবলিক বডি ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য ছিল, কাজেই সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ এর ১৫ নম্বর ধারা ওই সব কর্মচারীর জন্য প্রযোজ্য হবে।