আপত্তিকর ও ক্ষতিকর সব কনটেন্ট সরাতে যুক্তরাষ্ট্রমুখী বাংলাদেশ

ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে রাষ্ট্রবিরোধী এবং সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ উসকে দেওয়ার মতো ক্ষতিকর কনটেন্ট সরানো সরকারের জন্য সাম্প্রতিক সময়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনসহ (বিটিআরসি) সরকারের একাধিক সংস্থা কাজ করছে। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষতিকর কনটেন্ট ফেসবুক-ইউটিউব থেকে সরাতেই পারছে না সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। আদালতের আদেশও আমলে নিচ্ছে না ফেসবুক, ইউটিউব তথা গুগল কর্তৃপক্ষ। নিরুপায় হয়ে সরকার এসব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের পরামর্শে ফেসবুক, ইউটিউব থেকে রাষ্ট্রবিরোধী ও দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর সব কনটেন্ট সরাতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে চুক্তির প্রস্তাব করতে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে একটি প্রস্তাব বিটিআরসি থেকে গত ২৫ জুলাই ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রের।

প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বুধবার বলেন, বিটিআরসির পাঠানো প্রস্তাবটি আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এস এম আলতাফ হোসেন বলেন, ফেসবুক-ইউটিউবের কিছু কিছু কনটেন্ট সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ উস্কে দেয়ার মতো ক্ষেত্র তৈরি করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের জানমালের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে। তাই ক্ষতিকর কনটেন্ট সরাতে সরকার যে চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে তা অবশ্যই সময়োপযোগী পদক্ষেপ। চুক্তির পাশাপাশি কৌশলগত অন্য প্রক্রিয়াগুলোও সচল রাখা উচিত। কারণ চুক্তি একটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। গুগল-ফেসবুক বাংলাদেশে নিবন্ধিত হয়ে ভ্যাট দিচ্ছে এটাও বড় অগ্রগতি বিটিআরসির তথা সরকারের।

বিটিআরসি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ফেসবুক ও ইউটিউবে প্রচারিত অনেক কনটেন্ট ধর্মীয় উগ্রবাদ উসকে দিচ্ছে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ উত্থানের ক্ষেত্র তৈরি করছে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। কিছু কিছু কনটেন্ট দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এমনকি কিছু কনটেন্ট ব্যক্তিবিশেষের জন্য চরম মানহানি ঘটাচ্ছে। এ ছাড়া কিছু কিছু অশ্লীল কনটেন্ট ফেসবুক, ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়ার কারণে মানসম্মানের ভয়ে অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এসব কনটেন্ট রিমুভ বা সরিয়ে নেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বিটিআরসিকে অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু অধিকাংশ কনটেন্ট কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড গাইডলাইনের কথা বলে দিয়ে মার্কিন এই দুই প্রযুক্তি কোম্পানি তা সরায় না বা রিমুভ করে না। অনেক সময় তারা সংশ্লিষ্ট কনটেন্ট সরাতে বিটিআরসির কাছে আদালতের আদেশ চেয়ে থাকে। আবার বিটিআরসি আদালতের আদেশ দেওয়ার পরও ওই কনটেন্ট সরানো হয় না। এতে রাষ্ট্রের পাশাপাশি নানা পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার ইউটিউব চ্যানেলে বাংলা ও ইংরেজিতে প্রচারিত ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার’স মেন’ দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় তোলে। আল জাজিরার এই প্রতিবেদনের কনটেন্ট ইউটিউবের পাশাপাশি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে এই কনটেন্ট সরিয়ে নিতে বিটিআরসি ফেসবুক ও ইউটিউব তথা গুগল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানায়। তখন এই দুই প্রতিষ্ঠানই বিটিআরসিকে জানায়, আদালতের আদেশ ছাড়া এ ব্যাপারে তারা পদক্ষেপ নিতে পারছে না। এর পর বিটিআরসি উচ্চ আদালতের আদেশের কপি দেয় ওই দুই প্রতিষ্ঠানকে। তার পরও আল জাজিরার ওই কনটেন্ট গতকাল পর্যন্ত ইউটিউব ও ফেসবুক থেকে সরানো হয়নি। এ রকম আরও কিছু বিদ্বেষমূলক ও উগ্রবাদ উসকে দেওয়ার মতো কনটেন্ট সরানোর জন্যও বিটিআরসি ফেসবুক এবং গুগল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, এই আলোচনা অব্যাহত থাকা অবস্থায় গত ২ জুন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের সভাপতিত্বে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ৬ষ্ঠ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় আন্তর্জাতিক নানা মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মিডিয়া ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

এ ছাড়া ডাটা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো, যথা ফেসবুক, ইউটিউবসহ অন্যান্য অফিসের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি ফেসবুক, ইউটিউব এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর অফিস বা কার্যালয় বাংলাদেশে স্থাপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রাখতেও সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এর পরই বিটিআরসি ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ক্ষতিকর কনটেন্ট সরাতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে চুক্তি করার প্রস্তাব করে সরকারের কাছে।

এই চুক্তির বিষয়ে গত ২৫ জুলাই বিটিআরসি থেকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় জঙ্গিবাদ ও দেশবিরোধী অপপ্রচার রোধকল্পে বিটিআরসি থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো তথা ফেসবুক, ইউটিউবসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ স্থাপনসহ প্রতি প্রান্তিকে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সভা আহ্বান করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ জুলাই গুগল সিঙ্গাপুর কার্যালয়ের গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স এবং পাবলিক পলিসি টিমের সঙ্গে বিটিআরসির চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে দ্বিতীয় প্রান্তিকে সমন্বয়সভা অনুষ্ঠিত হয়।

ওই সভায় অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে দেশীয় ব্যবহারকারীদের ডাটার সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার বিভিন্ন তদন্তের স্বার্থে ইউটিউব তথা তথ্য গুগল থেকে তথ্যপ্রাপ্তির বিষয়ে গুগল কর্তৃপক্ষের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তারা জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথা গুগলসহ যে কোনো মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান (টেক কোম্পানি) থেকে তাদের পরিচালিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর পরিচিত (আইডেন্টিফিকেশন) তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে চাহিত তথ্য বা ডাটা প্রদানের বিষয়ে তা মার্কিন আইনানুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তথ্যপ্রাপ্তির জন্য অনুরোধকারী দেশের মধ্যে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স ট্রিটি (এমএলএটি) বা দ্বিপক্ষীয় তদন্ত সহযোগিতা সংক্রান্ত চুক্তি থাকা আবশ্যক। এতদসংক্রান্ত চুক্তির জন্য বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের মধ্যে এমএলএটি বা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করা আবশ্যক বলে গুগল কর্তৃপক্ষ বিটিআরসিকে অবহিত করেÑ উল্লেখ করা হয়েছে বিটিআরসির চিঠিতে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান ডিআইজি মো. আসাদুজ্জামান গত রাতে বলেন, ফেসবুক-গুগলসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কিছু কিছু বক্তব্য, বিবৃতি, কনটেন্ট আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তথা মানুষের জানমালের নিরাপত্তার জন্য মাঝে মধ্যেই হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এসব কনটেন্ট আমাদের নজরে আসার পর তা অপসারণের বিষয়ে আমরা বিটিআরসিকে লিখে থাকি। তারা এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। যেগুলো অপসারিত না হয় সেগুলো নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়েই থাকে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, ইউটিউব, ফেসবুকে এখনো অনেক কনটেন্ট আছে যেগুলো দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। কীভাবে জঙ্গি হামলা চালাতে হবে, কীভাবে বোমা বানাতে হবে এ ধরনের অসংখ্য কনটেন্ট ইউটিউবে রয়েছে। এসব কনটেন্ট জরুরি ভিত্তিতে সরানো উচিত। কিন্তু ইউটিউব কর্তৃপক্ষ তা সরায় না।

বিটিআরসির কর্মকর্তারা বলছেন, গুগলের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড গাইডলাইন বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ নিয়ে কাজ করছে বিটিআরসি। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে চুক্তি হলে এসব কাজও সহজ হয়ে যাবে বলে বিটিআরসির কর্মকর্তারা জানান।

তারা এও বলছেন, ফেসবুক ও গুগলকে বাংলাদেশে অফিস খুলতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ নিয়ে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে।

এদিকে সরাসরি সম্প্রচারের যুগে বিতর্কিত ভিডিওর বিরুদ্ধে ফেসবুক-ইউটিউব এতদিন মুখ বুজে ছিল। উগ্রবাদ, সহিংসতার ভিডিও নিয়ে অনেকে সমালোচনা করলেও তা গায়ে মাখেনি ইন্টারনেটের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। সম্প্রতি ইউরোপজুড়ে বেড়ে যাওয়া সন্ত্রাসী হামলার মুখে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। ফেসবুক-গুগলকে চাপ দিতে শুরু করেছে ইউরোপের দেশগুলো। সম্প্রতি নিজেদের অবস্থান বদলে নীতিমালা পরিবর্তনের কথা বলেছে প্রতিষ্ঠানগুলো।